Thursday , 29 October 2020
আপডেট
Home » জাতীয় » অবশেষে টিটুর পক্ষে আইনজীবী
অবশেষে টিটুর পক্ষে আইনজীবী
গ্রেপ্তার হওয়া টিটু রায়কে নিয়ে যাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা

অবশেষে টিটুর পক্ষে আইনজীবী

স্টাফ রিপোর্টার: অবশেষে রংপুরের টিটু রায় পেলেন আইনজীবী। আজ সোমবার তাঁর হয়ে আইনি লড়াই করতে স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের সাত আইনজীবী কাজ শুরু করেছেন। দুই দফায় আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া টিটু রায়কে। এত দিন তাঁর পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানোয় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁরা বলেছেন, এটা আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের ব্যর্থতা।
স্থানীয় আইনজীবীদের কেউ কেউ বলেছেন, বিচারিক কাজের এ পর্যায়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ অনুরোধ না করলে আইনজীবীরা দাঁড়ান না। টিটুর পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ অনুরোধ না জানানোর জন্যই তাঁরা এগিয়ে আসেননি।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, তাঁরা সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে ১০ নভেম্বর রংপুরের সদর উপজেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের আটটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গিয়ে শটগানের গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এ সময় সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হন। সাত পুলিশ সদস্যসহ ২৫ জন আহত হন।
ঠাকুরপাড়ার মৃত খগেন রায়ের ছেলে টিটু রায় তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে ধর্ম অবমাননাকর একটি পোস্ট দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ১৩ নভেম্বর নীলফামারীর জলঢাকা থেকে পুলিশ টিটুকে গ্রেপ্তার করে। তবে ১১ নভেম্বর রংপুরের এসপি মিজানুর রহমান বলেন, টিটু রায়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো প্রমাণ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ধর্মীয় বিষয়টিকে আঘাত করে মানুষকে উসকে দেওয়া হয়েছে।
টিটুকে গ্রেপ্তারের পর ১৫ নভেম্বর রংপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালত চার দিন এবং পরে গত শনিবার আবারও চার দিন দুই দফায় পুলিশের রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর করেন।
এ সময়ে কোনো আইনজীবী টিটুর পক্ষে দাঁড়াননি। আইনি সহায়তা নিতে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও কেউ যাননি। টিটুর ভাই বিপুল রায় বলেন, ‘ঘটনার পর অস্থির হয়ে গেছি। আইনজীবীর কাছে যেতে পারিনি। বেঁচে থাকাই এখন আমাদের দায় হয়ে গেছে।’
বিপুল জানান, টিটু রায় প্রায় নয় বছর আগে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। এরপর হঠাৎ আছড়ে পড়েছে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে এই হামলা। পুরো পরিবার এখন বিপর্যস্ত। তাঁদের মা জিতেন বালা এখন কোনো কথা বলেন না। বিপুল বলছিলেন, ‘মনে হয়, আমাদের কেউ নেই।’
পরিবারটির যখন এ অবস্থা, তখন টিটুর হয়ে আইনি সহায়তায় কেন কেউ এগিয়ে আসেনি? রংপুরের আইনজীবীদের কয়েকজনকে এ প্রশ্ন করে নানা উত্তর পাওয়া গেছে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল মালেক বললেন, ‘এখন কে টিটুর পক্ষে যাবে? কেউ তো অনুরোধ জানায়নি। জানালে না হয় যেত। এ সময় উকিলদের না বললে কেউ যায় না।’ তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক এনজিও আছে, মানবাধিকার সংগঠন আছে, তারাও তো আসতে পারত। এত হিন্দু উকিল আছেন, তাঁরাও তো দাঁড়ালেন না।’
পিপি আবদুল মালেক বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে তো রাষ্ট্র নিজেই আইনজীবী নিয়োগ দেবে।
জেলার পিপির মতোই কথা বললেন রংপুরের মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী মুনীর চৌধুরী। তাঁর মতে, এই অবস্থায় অনুরুদ্ধ না হলে কোনো আইনজীবী সাধারণত দাঁড়ান না।
রংপুরের আইনজীবী এবং জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক রথীশ চন্দ্র রায় অবশ্য পিপির বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, টিটু রায় হিন্দু সম্প্রদায়ের। তবে তাঁকে এভাবে পরিচিত করা ঠিক না। তাঁকে একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থী হিসেবেই দেখা উচিত।
টিটুর আইনি সহায়তার জন্য সাতজন আইনজীবীর একটি প্যানেল তৈরি করে তাঁরা সহায়তার চেষ্টা করছেন বলে জানান রথীশ রায়।
টিটু রায়ের পরিবারের সদস্যরা কেন তাঁর হয়ে আইনি সহায়তা নিতে পারেননি, সে কথা তাঁরা বলেছেন। টিটুর পরিবারের সদস্য আছে। এমন কোনো ব্যক্তি যদি এ অবস্থায় পড়েন এবং তাঁর যদি পরিবারের কেউ না থাকে, তবে কেউ কি তাঁর পক্ষে যাবে না? আবার অনুরোধ না পেলে কারও পক্ষে দাঁড়ানো যাবে না এমন বক্তব্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘অনুরোধ করার কেউ না থাকলে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানো যাবে না—এমন কোনো কথা নেই। আইনজীবীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই টিটু রায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারতেন। তাঁদের এই ব্যর্থতা আমাকে দুঃখ দিয়েছে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘টিটু রায়ের আইনি সহায়তায় কারও এগিয়ে না আসা আমাদের সামগ্রিক দীনতাকে তুলে ধরে। এটা স্রেফ গা বাঁচানোর কৌশল। আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীরা সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
জাতীয় পর্যায়ের নানা আইনি সহায়তা দানকারী মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা ইতিবাচক ছিল না বলে মনে করেন অধ্যাপক মিজান।
জাতীয় পর্যায়ের সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংগঠনটি রংপুরের ঘটনার পরই সেখানে একটি অনুসন্ধান দল পাঠায় বলে জানান এর উপপরিচালক (অ্যাডভোকেসি) মাহবুবা আখতার। রিমান্ডের সময় টিটুর জন্য আইনি সহায়তায় এগিয়ে না আসার বিষয়ে মাহবুবা বলেন, আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তুলতে কিছুটা সময় চলে গেছে। তবে টিটু রায়কে সহায়তা দেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা আছে।
টিটু রায়ের পক্ষে কারও না দাঁড়ানোর ঘটনায় ‘আশ্চর্য লেগেছে’ বলে জানান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। স্থানীয় আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীদের এগিয়ে আসা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি। মানবাধিকারের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হয়ে তবে কমিশন কেন এ ঘটনায় টিটুর পক্ষে দাঁড়ায়নি? এ প্রশ্নের জবাবে কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘আইনজীবীদের সহযোগিতা নেই—এ বিষয়টি আমরা জানতাম। এখন দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডের ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। এখন আমরাও বিষয়টি দেখব। কোন ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া যায়, সেই বিষয় বিবেচনা করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*