Sunday , 16 May 2021
আপডেট
Home » অনলাইন » সম্রাটের উত্থান যেভাবে
সম্রাটের উত্থান যেভাবে
ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট

সম্রাটের উত্থান যেভাবে

ডেস্ক রিপোর্ট: ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি। জুয়া খেলা তার নেশা। বিদেশেও জুয়া খেলেন। ঢাকায় তার হাত ধরেই ক্যাসিনোর শুরু। মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরেরপুল, পল্টন এলাকাসহ অন্তত ১০টি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িত। ক্যাসিনো ছাড়াও ঢাকা মহানগর দক্ষিণে গত ১০ বছর প্রভাব ধরে রেখেছেন।
চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বাড়ি ও জমি দখল- সবই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। এসব উৎস থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। চাঁদাবাজিতে সিদ্ধহস্ত তিনি। আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামে জাকাতের অর্থ ও অনুদানেও চাঁদার ভাগ বসানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
রোববার সম্রাট গ্রেফতার হওয়ার পর যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, কাকরাইল মোড়ে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালের মাঝামাঝি।
ওই বছরের শেষ দিকে চতুর্থ তলার একটি কক্ষে প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয় খোলেন ইসমাইল সম্রাট। তখন তিনি মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
পরের আট বছরের মধ্যে পুরো ভবনই তার দখলে নিয়ে নেন। এখান থেকেই সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলাসহ অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণও এ ভবন থেকেই করতেন।
সম্রাটের জন্ম ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব সাহেবনগর গ্রামে। তার বাবা ফয়েজ আহমেদ ছিলেন রাজউকের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
বাড়ি পরশুরামে হলেও বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকায় বড় হন সম্রাট। বসবাস করতেন কাকরাইলে সার্কিট হাউস সড়কের সরকারি কোয়ার্টারে। ঢাকায় সম্রাটের উত্থান রাজনীতির চোরাগলির মধ্য দিয়েই।
তার রাজনীতির জীবন শুরু ১৯৯০ সালে। সেই সময় সম্রাট ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রমনা অঞ্চলে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।
তখন নির্যাতনসহ জেলেও ছিলেন তিনি। এরপর থেকেই ‘সম্রাট’ খ্যাতি পান সাহসী সম্রাট। ছাত্রলীগে থাকাবস্থায় ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপি।
এরপর তার নামে একাধিক মামলা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। ২০০৩ সালে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই সময় দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন।
মূলত শাওনই তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। ২০১২ সালে সম্রাট ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি হন। ১/১১-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সময় তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ফের ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিকভাবে আরও ক্ষমতাবান হতে থাকেন। আওয়ামী লীগের বড় বড় অনুষ্ঠানে পরিচিত মুখ হিসেবে উপস্থিতি বাড়তে থাকে।
দলীয় সমাবেশগুলো সফল করতে টাকা ও জনবল সরবরাহের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তিনি। এসব কারণে দ্রুতই যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
তাকে যুবলীগের শ্রেষ্ঠ সংগঠক তার ইউনিটকে শ্রেষ্ঠ সাংগঠনিক ইউনিট ঘোষণা করেন। সম্রাটের ছিল বিশাল বাহিনী। কাকরাইলের অফিসে অবস্থান করলেও তাকে ঘিরে রাখত কয়েকশ’ নেতাকর্মী।
চলাফেরা করতেন শতাধিক নেতাকর্মীর প্রটোকল নিয়ে। অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়েই এ বাহিনী পালতেন। টাকার ভাগ-বাটোয়ারার ক্ষেত্রে বিশেষ সুনাম ছিল সম্রাটের।
মূলত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দক্ষিণ যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা মিল্কীর হত্যাকাণ্ডের পর মতিঝিল, ফকিরেরপুল, পল্টন, কাকরাইল, বাড্ডা এলাকার অপরাধ জগতে সম্রাটের একক আধিপত্য তৈরি হয়।
ঢাকার এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী, সম্প্রতি দুবাইয়ে আটক জিসান আহমেদের সঙ্গেও তার সখ্য ছিল। পরে অবশ্য দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সম্রাট পরিবার নিয়ে থাকতেন মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাড়িতে। বড় ভাই বাদল চৌধুরী ঢাকায় তার ক্যাসিনো ব্যবসা দেখাশোনা করতেন।
ছোট ভাই রাশেদ ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। তার বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। মা বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর সম্রাটের পরিবারের সবাই গা ঢাকা দেন।
সাম্প্রতিক অভিযানে গ্রেফতার ঠিকাদার জি কে শামীমও সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ দুই সহচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ (কাউন্সিলর) ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। সাঈদকে কাউন্সিলর বানান সম্রাটই। পরে তাকে ক্যাসিনো ব্যবসা দেখভালের দায়িত্ব দেন।
সম্রাটের নেশা ও ‘পেশা’ জুয়া খেলা। তিনি একজন পেশাদার জুয়াড়ি। প্রতিমাসে অন্তত ১০ দিন সিঙ্গাপুরে যেতেন জুয়া খেলতে। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকেও আসেন জুয়াড়িরা।
কিন্তু সেখানেও সম্রাট ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রথম সারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনো পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিলাসবহুল গাড়ি ‘লিমুজিন’-এ।
র‌্যাবের অভিযানে সম্রাটের সঙ্গে আরমানুল হককেও গ্রেফতার করা হয়েছে। সম্রাটের আর্থিক লেনদেনগুলো করে থাকেন আরমান। ঠিকাদার হিসেবেও আরমানের পরিচিতি রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে সম্রাট তাকে সহযোগিতা করেন বলেও জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*