Wednesday , 28 October 2020
আপডেট
Home » লাইফ স্টাইল » অ্যালোভেরার ১৪ গুণ
অ্যালোভেরার ১৪ গুণ

অ্যালোভেরার ১৪ গুণ

লাইফস্টাইল ডেস্ক: আমি যদি বলি ঘৃতকুমারী তাহলে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারবেন না । কিন্তু অ্যালোভেরা বললে সবার চোখে ভাসতে থাকবে সবুজ এই গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদটি। অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী যাই বলি না কেন এর গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। কেননা এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক, ফলিকঅ্যাসিড, অ্যামিনো অ্যাসিড ও ভিটামিনএ, বি৬, বি২ ইত্যাদি। তাই তো প্রাচীনকাল থেকেই ওষুধসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই ভারতীয় ভেষজ উদ্ভিদটি। তবে ইদানিংকালে দেশি বিদিশি মিডিয়ায় প্রচারণার ফলে তরুণদের মধ্যে এই উদ্ভিদের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। আজ আমরা অ্যালোভেরার অসাধারণ কিছু গুণাগুণ তুলে ধরবো।
১। রূপচর্চায় অ্যালোভেরা: রূপচর্চায় এর নানাবিধ ব্যবহার রয়েছে। যেমন ত্বক গ্লো করা ও তারুণ্য ধরে রাখতে এর জুড়ি মেলা ভার। অ্যালোভেরায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের গভীরে পৌঁছে চামড়া থেকে বয়সের ছাপ দূর করে। পাশাপাশি এতে থাকা ভিটামিন এ, বি ও সি ত্বকের পুষ্টি জোগায়। আর তাই শুষ্ক ত্বকের জন্য অ্যালোভেরা দারুণ উপকারি। দেশি বিদেশি বেশির ভাগ কসমেটিকসেই কিন্তু অ্যালোভেরা থাকে। আজকাল তো অ্যালোভেরার সাবান, ফেসওয়াশ, সানস্ক্রিন, বডি লোশন নানান কসমেটিকস হরহামেশাই পাওয়া যায়। আপনি যদি সেসব ব্যবহার করতে না চান তাহলে সরাসরি ত্বকে লাগাতে পারেন অ্যালোভেরা জেল। এতে ত্বক ভালো থাকবে এবং নানা সমস্যা মিটে যাবে।
ঠোঁটের যত্নেও অ্যালোভেরার ভূমিকা রয়েছে। এক টেবিল চামচ চালের গুঁড়ার সঙ্গে অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে ঠোঁটে ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁটে লাগানোর পাঁচ মিনিট পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে ঠোঁটের রঙ উজ্জ্বল হবে। এ ছাড়া ঠোঁট হবে নরম ও মসৃণ।
ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে ব্যবহার করতে পারেন অ্যালোভেরা মাস্ক। মাস্ক তৈরি করতে এক চা-চামচ অ্যালোভেরার জেল ব্লেন্ড করে নিয়ে তার সঙ্গে এক চা-চামচ ওটমিলের গুঁড়া এবং আধা চা-চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে নিতে হবে। এই মিশ্রণ মুখে ও গলায় লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখতে পারেন। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একবার এ কাজ করলে ত্বকের মরা চামড়া দূর হয়ে যাবে।
রোদে ঘোরার ফলে অনেকের ত্বকই রোদে পুড়ে যায়। সেই রোদে পোড়া দাগ দূর করতে দুই টেবিল চামচ অ্যালোভেরার জেলের সঙ্গে অর্ধেক লেবুর রস মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে নিন। এটি ত্বকে লাগিয়ে পনেরো মিনিট পর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি রোদে পোড়া দাগ দূর করার পাশাপাশি ত্বকের আর্দ্রতাও ধরে রাখবে।
এছাড়া বিভিন্ন চর্মরোগ ও ক্ষত সারায় অ্যালোভেরার জুসে। তাই অনেক সময় প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় এই অ্যালোভেরা।
২. কেশচর্চায় অ্যালোভেরা: চুলের যত্নেও দারুণ কাজ করে অ্যালোভেরা। এটি মাথার ত্বকের পিএইচ মাত্রা ঠিক রাখে। খুশকিও দূর করে। ২:১ অনুপাতে অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে মাথার ত্বকে মেখে সারা রাত রেখে দিয়ে সকালে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে করে চুলের খুশকি দূর হবে।
চুল পড়া বন্ধ করতেও অ্যালোভেরা ব্যবহার করতে পারেন। নিজের হেয়ার ব্রাশের মধ্যে ভালো করে জেল লাগান। এরপর জেল মাখানো ব্রাশ দিয়ে চুল আচড়ান। এভাবে কয়েকদিন ব্যবহার করলে চুল পড়া বন্ধ হবে।
৩. হার্ট সুস্থ রাখে অ্যালোভেরা: কেবল রূপচর্চা নয়, অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে থাকতে নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস বা শরবত খতে পারেন। এটি আপনার হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। অ্যালোভেরা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এটি ব্লাড প্রেসারকে নিয়ন্তর করে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং রক্তে অক্সিজেন বহন করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। দূষিত রক্ত দেহ থেকে বের করে রক্ত কণিকা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ফলে দীর্ঘদিন আপনার হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে।
৪. মাংসপেশীর ব্যথা কমায়: অ্যালোভেরা মাংসপেশীর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে থাকে। এমনকি ব্যথার স্থানে অ্যালোভেরা জেলের ক্রিম লাগালে ব্যথা কমে যায়।
৫। দাঁতের যত্নে অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরার জুস দাঁত এবং মাড়ির ব্যথা উপশম করে থাকে। দাঁতে কোন ইনফেকশন থাকলে তাও দূর করে দেয়। নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস খাওয়ার ফলে দাঁত ক্ষয় প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এছাড়া অ্যালোভেরায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন-সি যা মুখের জীবাণু দূর করে মাড়ি ফোলা, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করে। একই সঙ্গে মুখের দুর্গন্ধ দূ কর করতে সাহায্য করে। তাই অ্যালোভেরার জেল মাউথ ওয়াশ এর বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
৬. ওজন কমায়: ওজন কমাতে অ্যালভেরা জুস বেশ কার্যকরী। ক্রনিক প্রদাহের কারণে শরীরে মেদ জমে। অ্যালোভেরা জুসের অ্যাণ্টি ইনফ্লামেনটরী উপাদান এই প্রদাহ রোধ করে ওজন হ্রাস করে থাকে। পুষ্টিবিদগণ এই সকল কারণে ডায়েট লিস্টে অ্যালোভেরা জুস রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৭. হজমশক্তি বাড়ায়: হজমশক্তি বৃদ্ধিতে অ্যালোভেরা জুসের জুড়ি নেই। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া রোধ করে, যা হজমশক্তি বাড়িয়ে থাকে। অ্যালোভেরা ডায়রিয়ার বিরুদ্ধেও অনেক ভাল কাজ করে।
৮. ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে: অ্যালোভেরা জুস রক্তে সুগারের পরিমাণ ঠিক রাখে এবং দেহে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখে। ডায়াবেটিসের শুরুর দিকে নিয়মিত এর জুস খাওয়া গেলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। সুতরাং খাওয়ার আগে বা খাওয়ার পরে নিয়মিত অ্যালোভেরা জুস পান করুন তাহলে আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকবে।
৯। রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধি: অ্যালোভেরা হল অ্যান্টি ম্যাইকোবিয়াল এবং অ্যান্টি ফাঙ্গাল উপাদানসমৃদ্ধ একটি গাছ। অ্যালোভেরা জুস নিয়মিত পান করলে রোগ-প্রতিরোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দেহের টক্সিন উপাদান করে দূর করে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
১০। ক্যান্সার প্রতিরোধে অ্যালোভেরা: গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যালোভেরায় রয়েছে অ্যালো ইমোডিন, যা স্তন ক্যান্সার ছড়ানো থেকে রোধ করে। এছাড়াও অন্যান্য ক্যান্সার প্রতিরোধে অ্যালোভেরা অনেক কার্যকারী ভূমিকা পালন করে থাকে।
১১। উচ্চ রক্তচাপ কমায়: উচ্চ রক্তচাপ কমাতে অ্যালোভেরার কোন তুলনা নেই। অ্যালোভেরার ঔষধি গুণ রক্তচাপ কমায় এবং রক্তে কোলেস্টেরল ও চিনির মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে সাহায্য করে।
১২। ক্ষতিকারক পদার্থ অপসারণ: কিছু ক্ষতিকর পদার্থ দেহের মধ্যে প্রবেশ করে নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি করতে পারে। ফলে তা দেহের জন্য মোটেও ভাল কিছু নয়।এই সকল ক্ষতিকর পদার্থ দেহ থেকে অপসারণ প্রয়োজন। অ্যালোভেরার রস পান করলে দেহের ক্ষতিকর পদার্থ প্রবেশ করতে পারে না। আর যদি প্রবেশ করেও ফেলে, তাহলেও অ্যালোভেরার জুস পানে তা অপসারণ হতে সাহায্য করে। এই ক্ষেত্রে অ্যালোভেরার জুসের গুন অপরিসীম।
১৩। ক্লান্তি দূর করে: দেহের দুর্বলতা দূর করতে অ্যালোভেরার জুসের গুন অনেক। আপনি যদি অ্যালোভেরার জুস নিয়মিত পান করেন তাহলে দেহের ক্লান্তি দূর হবে এবং দেহকে সতেজ ও সুন্দর রাখবে।
১৪। কোষ্ঠকাঠিন্য সারায়: অ্যালোভেরার জেল নিয়মিত পানে পেটের নানা সমস্যা দূর হবে। আর যদি সুষম খাদ্যের পাশাপাশি নিয়মিত অ্যালোভেরার রস পান করেন তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকবে না। এছাড়া অ্যালোভেরা জেলে প্রায় ২০ রকম অ্যামিনো অ্যাসিড আছে যা ইনফ্লামেশন এবং ব্যাকটেরিয়া রোধ করে হজম, বুক জ্বালাপোড়া রোধ করে থাকে।
আজ তো অ্যালোভেরার মাত্র ১৪টি গুণের কথা বললাম। আগামীতে এ নিয়ে আরও কথা বলা যাবে। তবে বন্ধুরা, জুস বা শরবত হিসাবে খাওয়ার সময় খেয়াল রাখবেন অ্যালোভেরার পাতাটি যেন টাটকা ও সবুজ হয়। পাতা একটু বেশি পুরাতন হয়ে হলদেটে ভাব এলে তা ফেলে দিন। কেননা হলুদ পাতার জেল ব্যবহারে উপকারের চেয়ে অপকার-ই বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*